Tuesday, January 31, 2023
বাড়িopinion১৪ বছর পর ব্রিগেডিয়ার বারী জানালেন সেদিন তিনি রাষ্ট্রপতির ডাকে যাননি, গিয়েছিলেন...

১৪ বছর পর ব্রিগেডিয়ার বারী জানালেন সেদিন তিনি রাষ্ট্রপতির ডাকে যাননি, গিয়েছিলেন ক্ষমতা দখল করতেই : শামসুল

Ads

বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ নির্বাচন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও নির্বাচন কমিশন গঠন নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে অনাস্থা সৃষ্টি হওয়ার প্রেক্ষাপটে ২০০৭ সালের ১/১১তে দেশে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়। রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয় সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই প্রসঙ্গে একটি স্ট্যাটাস দিয়েছেন লেখক শামসুল আলম। নিচে সেটি তুলে ধরা হল –

বাংলাদেশ ধংসকারী কুখ্যাত “ওয়ান ইলেভেনের” অন্যতম কুশীলব চৌধুরী ফজলুল বারী (ব্রিগেডিয়ার বারী নামে পরিচিত) অবশেষে ১৪ বছর পরে মুখ খুললেন। বলার চেষ্টা করলেন ১/১১তে কি ঘটেছিল কেনো ঘটেছিল- নেপথ্য কথা!
কিন্তু কি বললেন তিনি?

ব্রিগেডিয়ার বারী তার বক্তব্যের শুরুতে ওয়ান ইলেভেন কেন ঘটেছিল বলতে গিয়ে ২৮ অক্টোবরের লগি বৈঠা দিয়ে হত্যাকাণ্ডকে অন্যতম কারণ হিসাবে দাবী করলেন। এরপর বললেন দেশের রাজনৈতিক সহিংসতা এতটাই বেশি হয়েছিল যে, তার বাচ্চা নাকি স্কুলে যেতে পারছিল না, সেজন্যই তাদের হস্তক্ষেপ করতে হয়েছে। কি ফানি কথাবার্তা! তাদের হস্তক্ষেপ করার বিষয়টা বোঝাতে তিনি প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থা অর্থাৎ ডিজিএফআয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান ছিলেন, সেই ক্যাপাসিটিতে তিনি নাকি রাষ্ট্র কিভাবে চলবে সেটা ঠিক করার অথরিটি সম্পন্ন ছিলেন! তিনি এ নিয়ে তিন বহিনী প্রধানের সাথে পরামর্শ করেছিলেন রাষ্ট্রে কি মার্শাল‘ল হবে, নাকি জরুরি অবস্থা, অথবা রাজনৈতিক সমঝোতা? এবং তিনি নিজে জরুরী অবস্থা জারীর পক্ষে অবস্থান নিয়ে তিন বাহিনীর প্রধান ও অন্যান্য জেনারেলদের কাছে তদবীর চালাতে থাকেন।

কিন্তু কেনো? তার কি এই কাজ করার এখতিয়ার ছিল? বিশেষ করে তিনি নিজে তিনি যেখানে স্বীকার করেছেন যে, ডিজিএফআই ভারপ্রাপ্ত প্রধান হিসেবে ডিফেন্স মিনিস্টার তথা রাষ্ট্রপতির সরাসরি অধীনস্থ ছিলেন। কোনো অবস্থাতেই তিনি সেনাপ্রধানের কাছে রিপোর্টিং অফিশিয়াল ছিলেন না! কিন্তু তা স্বত্ত্বেও তিনি দায়িত্ব ও এখতিয়ারের বাইরে গিয়ে রাষ্ট্রে জরুরী অবস্থা জারীর মাধ্যমে ক্ষমতা দখলের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছিলেন। বাহিনীর প্রধানদেরকে ক্ষমতা দখলে উস্কানি দেয়া তো সরাসরি রাষ্ট্রদ্রোহিতার অপরাধ।

এটা সত্য যে, বাংলাদেশের রাজনীতি সুগঠিত হয়নি আজও, বাংলাদেশের গণতন্ত্র ভয়ানকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ, রাজনৈতিক সংঘাত হানাহানি অতীতেও হয়েছে, এখনো হচ্ছে, তখনও হয়েছিল, কিন্তু তাই বলে তারা জরুরি অবস্থা জারি করার নামে দেশজুড়ে ধর মার কাট তান্ডব করবেন, দেশে অর্থনৈতিক সংকট সৃষ্টিসহ ভয়াবহ অনাসৃষ্টি অশান্তি বাধাবেন এবং শেষে একটা পাতানো নির্বাচনের মাধ্যমে ভারতের রাডারের ভেতরে দেশটা ঢুকিয়ে চলে যাবেন, এই ক্ষমতা ও এখতিয়ার তো তাদের ছিল না। পেশাদার সৈনিকের কাজ দেশ রক্ষা করা, কোন অবস্থাতেই প্রতিবেশী শক্তির কাছে দেশ তুলে দেয়া নয়।

একটি ঘটনা থেকে তার বক্তব্যের মিথ্যা এবং অসাড়তা প্রমানিত হয়ে যাবে। আর তা হলো তিনি দাবী করছেন ১১ জানুয়ারি দুপুরে সেনাপ্রধান মইন যে বাকী দুই বাহিনী প্রধানকে নিয়ে বঙ্গভবনে ঢুকেছিলেন সেটা নাকি রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহমেদের ডাকে সাড়া দিয়ে। কিন্তু বাস্তবে এটা ছিল মিথ্যা, রাষ্ট্রপতি তিন বাহিনীর প্রধানকে সেদিন ডাকেননি- এটা হলে চরম সত্য কথা। রাষ্ট্রপতি তাদেরকে কোনো এপয়েন্টমেন্ট না দিলেও রাষ্ট্রপতির সামরিক সচিব মেজর জেনারেল আমিনুল করিমের সাথে যোগসাজস করে তারা বঙ্গভবনে ঢুকেছিলেন।

 

জেনারেল মইন তার বইতে লিখেছেন, বঙ্গভবনে যাওয়ার আগে তাকে অনেক ভাবনায় পড়তে হয়েছে এবং নিজের জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কায় ছিলেন, তিনি ফিরবেন কি ফিরবেন না, বাঁচবেন কি মরবেন সেই চিন্তায় ছিলেন। কেননা তিনি একটি অসম্ভব কাজ করতে যাচ্ছেন, আর সেই অসম্ভব কাজটি হচ্ছে, জরুরি অবস্থা জারির মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করতে যাচ্ছিলেন। তিনি তার বৌ-বাচ্চাকে জুনিয়রদের হাতে তুলে দিয়ে যান। রাষ্ট্রপতির ডাকে গেলে তিনি এইসব ভাববেন কেনো? এতে প্রমান হয় যে তিনি রাষ্ট্রপতির ডাকে যাননি, বরং ক্ষমতা দখল করতেই গিয়েছিলেন। তার মানে বারী সাহেব বঙ্গভবনের ঘটনাবলীকে মিথ্যা দিয়ে ভিন্নভাবে প্রচার করার চেষ্টা করছেন।

আরও একটি বিষয়, ব্রিগেডিয়ার বারী বঙ্গভবনে ঢুকেছিলেন সকালে, রাষ্ট্রপতির সভাপতিত্বে আইনশৃঙ্খলার মিটিয়ে যোগ দিতে। অবশ্য তিনি স্বীকার করেছেন যে, সাথে করে জরুরী অবস্থা জারী করার অর্ডার, বিধি, ঘোষণাপত্র, এমনকি রাষ্ট্রপতির বক্তৃতার খসড়াও সাথে করে নিয়ে গেছেন! তার মানে দাড়ায়, তিনি এবং জেনারেল মইন আগে থেকেই ঠিক করে গেছেন, যেভাবেই হোক জরুরী অবস্খা ঘোষণা করে রাষ্ট্রক্ষমতা নিজেদের কাছে আনবেনই।

বারী সাহেব দাবী করছেন, বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহমেদকে একটি রুমে আবদ্ধ করে তাঁর ইচ্ছার বিরুদ্ধে জরুরী অবস্খা জারী করানো হয়নি। কিন্তু বাস্তব সত্য ছিল এই যে, বঙ্গভবনে শত শত অস্ত্রধারী সৈন্য ঢুকিয়ে সেটি দখল নেয়া হয়েছিল, এসএসএফ রাষ্ট্রপতিকে একটি বসার ঘরে ঢুকিয়ে তিন বাহিনী প্রধানের সাথে সাক্ষাৎ ঘটায়, সেখানে বারী সাহেবও উপস্থিত ছিলেন। এমনকি রাষ্ট্রপতির পরিবার যে কক্ষে ছিল, তার বাইরেও সশস্ত্র প্রহরা ছিল। রাষ্ট্রপতি এতটাই বন্দী ছিলেন যে, তিনি তাঁর স্ত্রীর সাথেও কথা বলার সুযোগ পাননি।

একটা প্রশ্ন উঠতে পারে, আমি তো তখন বঙ্গভবনে ছিলাম না, এত কথা জানলাম কি করে? আসলে আমি ঘটনার মাসখানেক আগেই এক মিলিটারী জেনারেল মারফত জেনেছিলাম, জেনারেল মইন ক্ষমতা দখল করবে। আর তাই তখনকার ঘটনাবলী খুব মনোযোগ দিয়ে লক্ষ রাখছিলাম। বঙ্গভবনে আমার ঘনিষ্ট যোগাযোগ ছিল। একটি কথা না বললেই নয়, ২৮ অক্টোবর লগিবৈঠার হত্যাকান্ডের কয়েকদিন আগে থেকেই ক্ষমতা দখলের প্রস্তুতি লক্ষ করছিলাম পিএমওতে বসে, বিষয়টা আমি ব্যক্তিগতভাবে জানি।

তাই ২৮ অক্টোবরে লগি বৈঠার ঘটনা আওয়ামীলীগ ঘটালেও এর সাথে ক্যান্টনমেন্টের ক্ষমতাদখলে ইচ্ছুক গ্রুপটির একটি যোগসাজশ ছিল। কেননা ২৮ অক্টোবরের ঘটনাকে কেন্দ্র করে ক্ষমতা নেয়া হবে এটা পূর্ব সিদ্ধান্ত ছিল, এ বিষয়টা আমি ব্যক্তিগতভাবে জানি। এরপর ২৯ অক্টোবর রাতে জরুরী অবস্থা দিয়ে ক্ষমতা দখল করার আয়োজনটি আমি নিজেই ভন্ডুল করে দিয়েছিলাম। অবাক লাগে, ওনারা কেমন গোয়েন্দা ছিলেন যে, তাদের ঐ প্রচেষ্টা কে নষ্ট করে দিয়েছিল, সে তথ্যটি আজও তাদের জানা নেই।

রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহমেদ জীবদ্দশায় অনেক কথা বলে গেছেন, এমনকি আমার সাথেও কথা হয়েছে উনার এবং উনি একটি বইও লিখে গেছেন যা এখনও প্রকাশিত হয়নি। সেখান থেকে অনেক কিছু বেরিয়ে আসবে।
আজকে হেসে হেসে মিষ্টি মিষ্টি কথা বললেও তখন তাদের চোখে দেখেছি ঔধ্যত্ত, উন্মাদনা, মানুষকে কিভাবে হয়রানি করার কি তান্ডব, অবৈধভাবে ক্ষমতা খাটানোর মহোৎসব।

রাষ্ট্র নিয়ে এরূপ খেলাধুলার পরিণামে কোটি মানুষের জীবন জীবিকা ধংস হয়েছে, সেগুলো তো আমরা দেখেছি। ওনারা এখন দাবি করছেন তখন নাকি দেশে রাজনৈতিক তাণ্ডব হচ্ছিল, কিন্তু পরে ওনারা কি করছিলেন? মহাতান্ডব ঘটিয়েছিলেন। একটা অন্যায় দিয়ে আরেকটা অন্যায়ের সংশোধন করা যায় না। উনারা দেশ নিয়ে যে অন্যায় করেছেন, দেশের মানুষের সর্বনাশ করেছেন এবং সর্বোপরি দেশের গণতন্ত্র এবং রাষ্ট্রক্ষমতাকে উনারা ভারতের হাতে তুলে দিয়ে গেছেন এই দায় একমাত্র উনাদের।

সাক্ষাৎকার দিতে গিয়ে বারী সাহেব নিজের বক্তব্যের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রতিপন্ন করতে গিয়ে বার বার আল্লাহর কসম কেটেছেন, কিন্তু এইভাবে যে কোন সত্য প্রতিষ্ঠা করা যায় না, বরং উল্টো মানুষ সন্দেহ করে। উনি যতই ঘুরিয়ে প্যাচিয়ে বলুন না কেন মিথ্যাকে তিনি সত্য বানাতে পারবেন না। আমরা এখনো জীবিত আছি। সময় হোক, তখন বিস্তারিত বলা যাবে।

Looks like you have blocked notifications!
Ads
[json_importer]
RELATED ARTICLES

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

Most Popular

Recent Comments