Friday , April 12 2024
Breaking News
Home / Exclusive / মহাকাশ হতে পৃথিবীতে পড়লো অজস্র কাচের টুকরো

মহাকাশ হতে পৃথিবীতে পড়লো অজস্র কাচের টুকরো

চিলির আতাকামা মরুভূমি জুড়ে ছড়িয়ে থাকা কাঁচের রহস্যময় অংশ সম্ভবত একটি অনেক আগে বিস্ফোরিত কোনো ধূমকেতু দ্বারা তৈরি হয়েছিল, এমনটাই একটি গবেষণা দাবি করেছে। গাঢ় সবুজ বা কালো কাচের টুকরো, যা এক দশক আগে বিজ্ঞানীদের নজরে এসেছিল, একটি বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে যা প্রায় ৫০ মাইল (৭৫ কিলোমিটার) জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল। এর কিছু কিছু ২০ ইঞ্চি (৫0 সেমি বড়) পর্যন্ত পাওয়া গিয়েছিল এবং মনে হয় যেন সেগুলি তাদের বর্তমান আকারে ভাঁজ করা হয়েছে কিংবা পেঁচানো হয়েছে।

এটা মনে করা হয়েছিল যে সেগুলো আগ্নেয়গিরির কার্যকলাপ কিংবা ঘাসে আগুন লেগে তৈরি হতে পারে – কারণ এই অঞ্চলটি সবসময় মরুভূমি ছিল না – কিন্তু ব্রাউন ইউনিভার্সিটির নেতৃত্বে নতুন গবেষণা একটি ভিন্ন উপসংহারে এসেছে। গবেষণায় দেখা গেছে যে, গ্লাসে খনিজ পদার্থের সাথে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশ রয়েছে যা প্রায়শই বহির্জাগতিক উত্সের শিলাগুলিতে পাওয়া যায়।

এই কাচ পৃথিবীতে তৈরি হতে পারে না। আমেরিকার রোড আইল্যান্ডে ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ববিদদের গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয়েছে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান গবেষণা পত্রিকা ‘জিওলজি’-তে।

পৃথিবীর বাইরে ভিন্‌ গ্রহ থেকে আসা রাশি রাশি কাচ ছড়িয়ে থাকার সেই রহস্যে মোড়া মুলুকটির নাম চিলির আটাকামা মরুভূমি। এক দশকেরও কিছু সময় আগে যে মরুভূমির ৭৫ কিলোমিটার (প্রায় ৫০ মাইল) এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে থাকা রাশি রাশি কাচের টুকরোর প্রথম হদিশ মিলেছিল। আর সেই সময় থেকেই যাবতীয় কৌতূহলের সূত্রপাত। কোথা থেকে এল, কারা নিয়ে এল এই রাশি রাশি কাচের টুকরো। অদ্ভুত আকারের সেই কাচের টুকরোগুলি। বিভিন্ন আকারের। একটার সঙ্গে অন্যটার মিল নেই কোনও। মরুভূমির বিভিন্ন জায়গায় অনেকটা এলাকা জুড়ে সেগুলি ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। যেন কাচের টুকরোর বিশাল আবর্জনা।

‘সেই রাশি রাশি কাচের টুকরোগুলির কোনওটা খুব এবড়োখেবড়ো, কোনওটা আবার একেবারেই মসৃণ, আবার কোনও কোনও কাচের টুকরো দেখে মনে হতে পারে, সেগুলিকে কোনও ভাবে ভাঁজ করা হয়েছে বা দোমড়ানো মোচড়ানো হয়েছে। পেরেকের নীচের দিকটার মতো। আর সেগুলি হয়েছে অন্তত ১২ হাজার বছর আগের কোনও ঘটনায়’, বলেছেন প্রধান গবেষক ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ভূতত্ত্ববিদ পিটার শ্যুল্‌জ।

আগের গবেষণাগুলি জানিয়েছিল, ১২ হাজার বছর আগে হয়তো কোনও সুবিশাল উল্কাখণ্ড আছড়ে পড়েছিল আটাকামা মরুভূমির বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে। পৃথিবীতে ঢোকার সময় বায়ুমণ্ডলের সঙ্গে সংঘর্ষে জ্বলে উঠেছিল উল্কাখণ্ডটি। তখনই তার থেকে ছিটকে বেরিয়ে আসতে থাকে অত্যন্ত উত্তপ্ত পাথরের রাশি রাশি টুকরো। সেগুলি এসে পড়ে মরুভূমির উপর। সেই তাপে গলে যায় মরুভূমির বালি ও মাটি। তার থেকেই সম্ভবত তৈরি হয়েছিল এই রাশি রাশি কাচ। কাচের টুকরো।

বিভিন্ন গবেষণা এর আগে আরও একটি কারণ দেখিয়েছিল। সেই সব গবেষণার বক্তব্য ছিল, পৃথিবী যখন ভ’/য়’ঙ্কর উষ্ণ ছিল কয়েক লক্ষ বা কয়েক কোটি বছর আগে তখনও তৈরি হতে পারে এই কাচ, ভূগর্ভের অত্যধিক তাপে। এ বারের গবেষণায় অধ্যাপক শ্যুল্‌জ ও তার সতীর্থরা মরুভূমির বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে ছড়ানো কাচের টুকরোর ৩০০টি নমুনা সংগ্রহ করে সেগুলিকে ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপের নীচে রেখে পরীক্ষা করেন। সেই কাচ কোন কোন রাসায়নিক পদার্থ দিয়ে তৈরি, তা জানার চেষ্টা করেন স্পেকট্রোস্কোপি পদ্ধতিতে।

ভূতত্ত্ববিদ শ্যুল্‌জ বলেছেন, পরীক্ষা নিরীক্ষা চালিয়ে এই প্রথম প্রমাণ মিলল এই কাচ পৃথিবীতে তৈরি হয়নি। তৈরি হতে পারে না। তা পৃথিবীর বাইরে কোনও ভিন্‌ মুলুক থেকেই এসেছিল আটাকামা মরুভূমিতে। আর সেগুলি নিয়ে এসেছিল কোনও সুবিশাল উল্কাখণ্ড। তাপ বিকিরণ আর বাতাসের জন্যই তৈরি হয়েছে এই রাশি রাশি কাচ আর তাদের বিভিন্ন আকার, আকৃতি। ওই কাচে মিলেছে জারকন্স-এর মতো পদার্থ। যা প্রচণ্ড তাপে রূপান্তরিত হয়ে গিয়ে হয়েছিল খনিজ পদার্থ ‘ব্যাডেলেইট’। যা হওয়ার জন্য ১ হাজার ৬৭০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার প্রয়োজন হয়। পৃথিবীতে কোনও দা’বানল বা ভূপৃষ্ঠের কোনও প্রাকৃতিক ঘটনায় যে তাপমাত্রায় পৌঁছনো সম্ভব হয়নি এখনও।

শুধু তাই নয়, এই রাশি রাশি কাচের টুকরোর রাসায়নিক বিশ্লেষণ করে যে খুব মিহি খনিজের অস্তিত্বের প্রমাণ মিলেছে, সেগুলি পৃথিবীতে বিরলতম। বরং সেগুলি পাওয়া যা উল্কাখণ্ডেই। তার মধ্যে অন্যতম পদার্থটি হল ‘কিউবানাইট’। পৃথিবীতে এই পদার্থটি বিরলতম। নেই বললেই হয়। ২০০৪ সালে নাসার ‘স্টারডাস্ট’ মিশন ‘ধূমকেতু ওয়াইল্ড-২’ থেকে প্রথম এই পদার্থটির হদিশ পায়। এটি পৃথিবীর বাইরের ভিন্ গ্রহেরই পদার্থ। তাই এই কাচের টুকরোগুলি পৃথিবীর বাইরে থেকেই এসেছিল আটাকামা মরুভূমিতে, এই ধারণায় পৌঁছলেন বিজ্ঞানীরা।

কিন্তু এখানেই শেষ নয়. কাচের টুকরোগুলিতে হাজার হাজার বহিরাগত খনিজ উপাদান রয়েছে, যা পৃথিবীতে খুব কমই দেখা যায়; বাস্তবে এটা খুবই বিরল, সেগুলো শুধুমাত্র উল্কাপিণ্ড এবং অন্যান্য বহির্জাগতিক শিলাগুলিতে পাওয়া যায়। বহির্জাগতিক কিউবানাইট সহ এই অদ্ভুত খনিজগুলির কিছু পূর্বে NASA এর স্টারডাস্ট মিশন দ্বারা চিহ্নিত করা হয়েছিল, যা ২০০৪ সালে ধূমকেতু ওয়াইল্ড ২ থেকে নমুনা সংগ্রহ করেছিল।

এটা নিশ্চিতভাবে বলা যায়, তবে আতাকামা মরুভূমিতে কাঁচের এই অদ্ভুত টুকরাগুলি তৈরি হতে দীর্ঘকাল সময় নেয়। বস্তুটি যাই হোক না কেন, এটি ওয়াইল্ড ২ এর সাথে কিছুটা সম্পর্ক বহন করতে পারে, অন্তত এর গঠনের দিক থেকে। আরও একটি কাকতালীয় ঘটনা যা আরও গুরুত্বপূর্ন তথ্য বহন করে তা হল, এই বায়ু বিস্ফোরণের সময়টি দক্ষিণ আমেরিকায় কোয়াটারনারি মেগাফাউনার অন্তর্ধানের সাথে বিস্তৃতভাবে ওভারল্যাপ করে, যেটা নিজেই এই অঞ্চলে প্রাচীন অনুসন্ধানী বা সংগ্রাহকদের আগমন এবং জলবায়ুর পরিবর্তন উভয়ের সাথেই মিলে যায়।
খবর সিএনএন এর।

About

Check Also

আটকের পর ২৪ ঘন্টা না যেতেই পুলিশ হেফাজতে যুবদল নেতার মৃত্যু

ঠাকুরগাঁও থানা হেফাজতে যুবদলের এক নেতার মৃত্যু নিয়ে অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশ দাবি করেছে, তিনি হৃদরোগে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *