Wednesday , April 17 2024
Home / Countrywide / দিয়াড় সাহাপুর গ্রাম দেখলে মনে হবে ইউরোপের একটি ছোট্ট শহর

দিয়াড় সাহাপুর গ্রাম দেখলে মনে হবে ইউরোপের একটি ছোট্ট শহর

৬ দশক সময়ের মধ্যেই এভাবেই সকল কিছু বদলে যাবে সেটা কখনও ভাবতে পারেনি এলাকার মানুষেরা। যেসব এলাকাতে সাধারণ মানুষেরা এক সময় প্রায় চলাচলই করতো না, সেই এলাকাগুলোতে এখন বিদেশি নাগরিকদের চলাচলে মুখরিত হয়ে উঠেছে।

আবাসিক এলাকাটি এখন এমন জায়গায় তৈরি করা হয়েছে যেখানে জঙ্গলে ভরা ছিল, ছিল নানা ধরনের বিষাক্ত সাপ ও পোকামাকড়ে ভরপুর। সেই পতিত স্থানে গেলে দেখা যায় ২০ তলা বিশিষ্ট ২১টি উঁচু ভবন। রাশিয়া, বেলারুশ এবং ইউক্রেনের প্রায় ৪,০০০ পুরুষ ও মহিলার বাস এই স্থানে।

এটি নির্মাণাধীন রূপপুর পা’রমা’ণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বসবাসের জন্য নির্মিত আবাসিক এলাকা ‘গ্রিন সিটি’ ছাড়া আর কিছুই নয়। অনেক আধুনিক শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত শপিং মল, সেলুন, সবজির বাজার এবং আরও অনেক প্রয়োজনীয় দোকান বিদেশীদের কেনাকাটার জন্য এই ‘গ্রিন সিটি’কে ঘিরে গড়ে উঠেছে। আর যাতে তারা সহজে বুঝতে পারে, সেসব দোকানের সাইনবোর্ডেও দেখা যাচ্ছে রাশিয়ান ভাষা।

ঈশ্বরদী উপজেলার সাহাপুর ইউনিয়নের দিয়াড় সাহাপুর ও অপরদিকে চরসাহাপুর গ্রাম। সেখানে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত রাশিয়ান নারী-পুরুষের পদচারণায় মনে হয় যেন রাশিয়ার কোনো একটি ছোট শহর এটি।

অতীতে এসব এলাকা ভুতুড়ে গ্রাম মনে হতো। দিনের আলোতে নাকি মানুষ চলাচল করতেও ভয় পেত। এলাকার কয়েকজন গণ্যমান্য ব্যক্তি মিলে উদ্যোগ নেন— সপ্তাহে দুদিন এখানে একটি হাট বসবে। তাৎক্ষণিক হাটের নাম দেওয়া হয় ‘নতুনহাট’। সেই থেকে এ এলাকার নাম হয়ে যায় ‘নতুনহাট’। এখন এই নতুনহাটেই বসছে উন্নতমানের জিনিসপত্রের পসরা। গড়ে উঠেছে এসি লাগানো দোকানপাট। সেগুলোতে রাশিয়ানরা কিনছেন জিনিসপত্র।

এলাকাটি দিয়েই চলে গেছে ঈশ্বরদী-কুষ্টিয়া সড়ক, যা সংক্ষেপে আইকে (ঈশ্বরদী-কুষ্টিয়া) রোড নামে পরিচিত। সড়কটি এখন বেশি ব্যবহৃত হয় রূপুপর প্রকল্পের গাড়ি চলাচলে। যেখানে একসময় ঘুটঘুটে অন্ধকার থাকত, সন্ধ্যা নামলে মানুষ চলাচল থেমে যেত; সেখানে এখন দেখা মেলে গভীর রাতেও ঝলমলে আলোর বিচ্ছুরণ। চারদিকে আলোকিত করে রেখেছে ‘গ্রিন সিটি’। গত তিন বছরে এখানে গড়ে উঠছে এই গ্রীণসিটি।

বিদেশি নাগরিকদের বসবাস করার জন্যই গড়ে তোলা বহুতলভবণ ‘গ্রিন সিটি’ নির্মিত হওয়ার কারণে বেসরকারি ব্যাংকের শাখা, বিদেশিদের বিনোদনের জন্য আধুনিক দৃষ্টিনন্দন পার্ক গড়ে উঠেছে।

ঈশ্বরদী উপজেলার সাহাপুর ইউনিয়নে ছোট এই গ্রামের ভেতরে গ্রিন সিটির মূল ফটকজুড়ে আধুনিকতার ছোঁয়া। দৃষ্টিনন্দন দোকানপাটের সমারোহ। বিদেশি নাগরিকরা ইচ্ছেমতো বেশ আন্তরিকভাবে স্বাচ্ছন্দ্যে চলাফেরা করেন, কোনো অসুবিধা হয় না। প্রথম দিকে কৌতূহল নিয়ে তাকাতেন স্থানীয়রা, এখন আর তা নেই। বিদেশিদের চলাফেরার কারণে গ্রাম হয়েছে আধুনিক শহর। বদলে গেছে এলাকার আর্থ-সামাজিক চিত্র।

একদিকে আংশিক বাংলাভাষা আয়ত্ত করে নিয়েছেন কিছু বিদেশি। আবার দোকানিরাও তাদের সঙ্গে কথা বলতে বলতে রাশিয়ান ভাষা আয়ত্ত করে নিয়েছেন। দিয়াড় সাহাপুরের নতুনহাট এলাকা শুধু নয়, তাদের চলাফেরার জন্য উপজেলার সলিমপুর, পাকশী ইউনিয়নের অন্তত ১০ গ্রামে লেগেছে পরিবর্তনের আধুনিক ছোঁয়া। দেশের একটি ইউনিয়ন পর্যায়ের গ্রামে যেন দেখা মিলছে বিদেশি সংস্কৃতির ছোঁয়া।

দিয়াড় সাহাপুর গ্রামের বাসিন্দারা জানান, তারা কখনও ভাবেননি এভাবে এই এলাকার পরিবর্তন হবে। তারা এখন সুন্দরভাবে ব্যবসা করে পরিবার-পরিজন নিয়ে ভালো আছেন। তাদের আয়-রোজগার বেড়েছে।

দিয়াড় সাহাপুর গ্রামের আল-আমিন বলেন, তিনি সপ্তাহে দুদিন নতুনহাট মোড়ে চুল কাটার কাজ করতেন। প্রথমে ১০০-২০০ টাকা আয় হতো। পরে দিয়াড় সাহাপুর গ্রামে গ্রিন সিটি হওয়ায় তিনি দুই বছরের মধ্যে নিজে একটি এসি সংযুক্ত করে আধুনিক সেলুন দিয়েছেন। রাশিয়ান নাগরিকদের চুলকাটা ও সেভ করলে ৫০০ টাকা, আর শুধু চুল কাটলে ২০০ টাকা দেয়। এতে সারাদিন তার আয় প্রায় ৩-৪ হাজার টাকা হয়। তিনি কর্মচারীও রেখেছেন। তার কর্মচারীও প্রতিদিন আয় করে প্রায় হাজার টাকা।

শাকিল হোসেন যিনি শর্মা জিয়েস্টের মালিক তিনি বলেন, রাশিয়ানদের সাথে প্রায় কথা বলতে হয় তার আর এভাবেই তিনি তাদের ভাষা প্রায় আয়ত্ত করে ফেলেছেন। শর্মা রাশিয়ানদের কাছে খুবই প্রিয় খাবার। শসা, টমেটো, গাজর, সস, পেঁয়াজ, ফুলকপি, পনির এই উপাদানগুলো রুটির সাথে দিয়ে তৈরী হয় শর্মা। শর্মা সাতটি ভিন্ন মূল্যে বিক্রি হয়ে থাকে। সপ্তাহে দুই দিন বিদেশি নাগরিকদের সমাগম হয় বিশ্বাস মার্কেটে।

গ্রিন সিটির ২১ টি সুন্দর ভবনের মাঝে বর্তমান সময়ে ৩,৮০০ ইউরোপীয়রা ১৬ টি বিল্ডিংয়ে বাস করছেন। আরও অনেকগুলো ভবনের কাজ চলমান রয়েছে। গ্রিন সিটির পাশাপাশি অবকাঠামোগত উন্নয়ন, ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসারসহ এলাকাটিতে এখন দৃশ্যমান উন্নয়নের ছোঁয়া দেখা গেছে। অজপাড়া এবং ভু’তুড়ে জংলি স্থান এখন বিদেশী শহরে রূপ নিয়ে পুরো সাহাপুর ইউনিয়নের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ঘটিয়ে চলেছে। যে পরিবর্তন চোখে পড়বে যে কোনো আগুন্তুকের।

 

 

 

 

 

 

About

Check Also

এবার সতর্কবার্তা দিল জার্মান দূতাবাস

ঢাকার জার্মান দূতাবাস অর্থের বিনিময়ে দূতাবাসের ভিসা অ্যাপয়েন্টমেন্ট বা জার্মান চাকরির চুক্তির প্রতিশ্রুতি দেয় এমন …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *