Tuesday, January 31, 2023
বাড়িopinionরাষ্ট্রদূত যার বাড়ি গিয়েছিলেন সেই সুমনকে গুম করে র‌্যাবের এক সিরিয়াল কিলার...

রাষ্ট্রদূত যার বাড়ি গিয়েছিলেন সেই সুমনকে গুম করে র‌্যাবের এক সিরিয়াল কিলার কর্নেল হায়াৎ : শামসুল

Ads

সম্প্রতি রাজধানী ঢাকার শাহিনবাগে গুম হওয়া এক ব্যাক্তির বাড়িতে দূতাবাসের কিছু কর্মীদের সাথে নিয়ে গিয়েছিলেন রাষ্ট্রদূত পিটার ডি হাস তবে সেখান থেকে বেরিয়ে নানা বাধার সম্মুখীন হন তিনি যা নিয়ে ওঠে আলোচনা। এই প্রসঙ্গে একটি স্ট্যাটাস দিয়েছন লেখক শামসুল আলম। নিচে সেটি তুলে ধরা হল-

গত ১৪ ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত পিটার ডি হাস শাহীনবাগে গুম হওয়া সুমনের বাড়িতে গিয়ে বাধার সম্মুখীন হয়েছিলেন, সেই সাজেদুল ইসলাম সুমনকে গুম/হত্যা কান্ড ঘটিয়েছিল- র‌্যাবের এক সিরিয়াল কিলার লেফটেনেন্ট কর্নেল কিসমত হায়াৎ।

লে. কর্নেল কিসমত ২০১৩ সালে র‍্যাব-১ এর কমান্ডিং অফিসার থাকাকালে টঙ্গী, গাজীপুর, দক্ষিনখান, উত্তরখান, বারিধারা, বাড্ডাসহ ঢাকা থেকে কমপক্ষে ২৫০ জন নাগরিক গুম/হত্যা করেছেন মর্মে অভিযোগ আছে, যাদের একটি বড় অংশ বিএনপির নেতাকর্মী। এছাড়াও পরে ২০১৪/১৫/১৬ সালে র‍্যাব-৪, র‍্যাব-১৩ এর কমান্ডিং অফিসার (সিও) ছিলেন। মূলত ২০১০ সাল থেকে র‌্যাবে কর্মরত। গুম এবং ক্রসফায়ার হত্যার জন্য কুখ্যাত হয়ে আছেন কিসমত। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে প্রত্যার্পনের পরে তার গুম খুনের দুর্নামের বিবেচনায় আর্মি তার দায়িত্ব নেয়নি, এবং অবসরে পাঠায়।

লে. কর্নেল কিসমত হায়াৎ, বিএ ৪৪৯০, ২৭ বিএমএ লংকোর্সে ২০ ডিসেম্বর ১৯৯২ তারিখে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং কোরে যোগদান। বাড়ি ময়মনসিংহ। আনন্দমোহন কলেজের ছাত্র। শিক্ষক পিতার পুত্র। বর্তমানে একপুত্র এক কন্যার জনক। স্ত্রী বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের ২৭তম ব্যাচের সদস্য, বর্তমানে প্লানিং কমিশনের উপসচিব। তবে চাকরি হওয়ার পরে স্বামীর ক্ষমতা খাটিয়ে মাঠে যেতে হয়নি, ঢাকাতেই থাকতে পেরেছেন, এবং দ্রুত পদোন্নতিও লাভ করেছেন। প্রভাব খাটিয়ে বিস্ময়করভাবে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের পার্সোনেল ডাটা শিটে স্বামীর নাম পরিচয় সব তথ্য মুছে ফেলতে সক্ষম হন!

সুমন গুমের ঘটনা:
——————–
২০১৩ সালের ৪ ডিসেম্বর রাতে রাজধানী বসুন্ধরা এলাকার আই ব্লক থেকে থেকে ৭ জন বিএনপি নেতা/কর্মীকে ধরে নিয়ে যায় কিসমতের বাহিনী। পরে তাদেরকে গুম বা হত্যা করা হয়। যাদের মধ্যে ঢাকার ৩৮ নম্বর ওয়ার্ডের বিএনপি সেক্রেটারি সাজেদুল ইসলাম সুমন অন্যতম। একই রাতে রাজধানী থেকে গুম করা হয় বিএনপি কর্মী কাওসার আহমেদকে। ৬ ডিসেম্বর একই বাহিনী ধরে নিয়ে যায় তেজগাঁও কলেজ ছাত্রদল নেতা তারিকুল ইসলাম ঝন্টুকে। অদ্যাবধি তাদের কোনো হদিস নেই।

২০১৩ সালের ৪ ডিসেম্বর রাত সাড়ে ৮ টা। রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার আই ব্লকের একটি নির্মানাধীন বাড়ির সামনে খালাতো ভাই জাহিদুলসহ ছয়জন মিলে মুড়ি-চানাচুর খাচ্ছিলেন ৩৮ নম্বর ওয়ার্ডের বিএনপি সেক্রেটারি সাজেদুল ইসলাম সুমন। সেখানে র‍্যাব-১ লেখা তিনটি গাড়ি এসে থামে। সাথে ছিল আরো কয়েকটি গাড়ি। সবার পরনে ছিল কালো পোশাক। অস্ত্রধারীদের কয়েকজন ভবনটির সামনে এসে সশব্দে জানতে চায় ‘তোমাদের মধ্যে কার নাম সুমন’? এ সময় সাজেদুল ইসলাম সুমন নিজের পরিচয় দেন। সাথে সাথে সুমন এবং তার খালাতো ভাই জাহিদুল করিম ওরফে তানভীর(৩০) সহ ছয়জনকে চোখ বেঁধে তুলে নিয়ে যায় ওই বাহিনী।

 

বাকি চারজন হলেন পূর্ব নাখালপাড়ার বাসিন্দা আবদুল কাদের ভূঁইয়া ওরফে মাসুম (২৪), পশ্চিম নাখালপাড়ার মাজহারুল ইসলাম ওরফে রাসেল (২৪), মুগদার আসাদুজ্জামান ওরফে রানা (২৭) ও উত্তর বাড্ডার আল আমিন (২৬)। এর কয়েক ঘণ্টা পর রাত দুইটার দিকে শাহীনবাগের বাসা থেকে একই বাহিনী তুলে নিয় যায় এএম আদনান চৌধুরী (২৮) নামের আরেকজনকে। প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে পরিবার জানিয়েছে, আদনানকে নিয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের পরনের কালো পোশাকের ওপর ‘র‍্যাব’ লেখা ছিল।

ঢাকা মহানগরের ৩৮ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সাজেদুল ইসলাম ওরফে সুমন (৩৪) ছিলেন বিএনপির অত্যন্ত নিবেদিতপ্রাণ কর্মী। নিজ দলের কাজ ছাড়াও এলাকার সাধারণ মানুষের বিপদে-আপদে ছুটে যেতেন নিঃস্বার্থভাবে। সাজেদুলের বাসা শাহীনবাগ এলাকায়। নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ব্যাপক ধরপাকড় পরিস্থিতিতে জীবনের সংশয়ে নিজ বাসা ছেড়ে সুমন আশ্রয় নেন বসুন্ধরায় আই ব্লকের এক খালার বাসায়। যদিও বসুন্ধরা থেকে উঠিয়ে নেওয়া ছয়জনের বিষয়ে সেই সময় গণমাধ্যমকে র‌্যাব-১এর অধিনায়ক কিসমত হায়াৎ বলেছিলেন যে, র‍্যাব-১-এর কেউ এতে জড়িত নয়। পরে অবশ্য সাজেদুল ইসলাম সুমনের বৃদ্ধা মা হাজেরা বেগমের কাছে সুমনকে তুলে আনার কথা স্বীকার করেছিলেন র‌্যাবের আকে পরিচালক কর্নেল জিয়াউল আহসান।

এই লে. কর্নেল কিসমতই ২০১৩ সালের ১২ ডিসেম্বর রাতে তার বাহিনী নিয়ে ঘেরাও করেন জাতীয় পার্টি প্রধান জেনারেল এরশাদের বাড়ি, পরে থেকে তুলে নিয়ে হাজির করে ডিজিএফআই প্রধানের সমানে। সেখানে তাকে চাপ দেয়া হয় ৫ জানুয়ারীর নির্বাচনে থাকতে হবে, অন্যথায় তাকে হত্যার হুমকিও দেয়া হয়। এমনকি মারধর করা হয় বলে জানা গেছে। পরে তাকে সিএমএইচে জোর করে আটকে রাখা হয় এক মাস, এবং ৫ জানুয়ারী বিনাভোটের নির্বাচনের পরে ছাড়া হয়।

গুম করা ছয় জনের পরিচয়:
————————–
কিসমত হায়াৎ বাহিনীর হাতে গুম হওয়া জাহিদুল করিম ওরফে তানভীর একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিএ শেষ করে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় নিজেদের নির্মাণাধীন ভবনের কাজ দেখাশোনা করছিলেন।
আবদুল কাদের ভূঁইয়া ওরফে মাসুম ছিলেন সরকারি তিতুমীর কলেজের ফিন্যান্স ও ব্যাংকিং বিভাগের সম্মান শেষ বর্ষের ছাত্র।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিষয়ে সদ্য স্নাতকোত্তর শেষ করেছেন মাজহারুল ইসলাম ওরফে রাসেল। তিনি ৩৪তম বিসিএসে প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে লিখিত পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে আইন বিষয়েও পড়াশোনা করছিলেন গুম হওয়া এই তরুণ।

আসাদুজ্জামান ওরফে রানা জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দর্শন বিভাগে স্নাতকোত্তর শেষ করে চাকুরি খুঁজছিলেন।
আল আমিন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে সম্মান শেষ করার পর অন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আইন বিষয়ে পড়াশোনা করছিলেন।

আর গুম হওয়া আদনান উচ্চমাধ্যমিক শেষ করে উচ্চশিক্ষার জন্য মালয়েশিয়ায় যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। নিখোঁজ আদনানের বাবা রুহুল আমিন তখন গণমাধ্যমকে বলেন যে, ৪ ডিসেম্বর রাত দুইটার দিকে শাহীনবাগের বাসার মূল ফটকে কয়েকজন জোরে জোরে আঘাত করেন। তিনি দরজা খুলে দেন। দেখতে পান যে ১৪-১৫ জন কালো পোশাকধারী লোক অস্ত্র হাতে দাঁড়িয়ে। তাদের সাথে একটি সাদা ও একটি ছাই রঙের মাইক্রোবাস দাঁড়ানো। তারা প্রশাসনের লোক পরিচয় দিয়ে জোর করে বাসার ভেতরে ঢোকে এবং আদনানকে খুঁজতে থাকেন। আদনান তার কক্ষ থেকে বের হলে তারা তাকে চোখ বেঁধে নিয়ে যায়। আদনান গুম হওয়ার পর রুহুল আমিন গণমাধ্যমকে আরো বলেছিলেন যে, কালো পোশাকধারীরা সবাই হাফ হাতা জ্যাকেট পরা ছিল। কোমর বরাবর জ্যাকেটে হলুদ রঙে ‘RAB’ লেখা ছিল।

কিসমত হায়াৎ বাহিনীর হাতে বিএনপির এই আট তরুণ ছাড়াও অনেক নিরপরাধ মানুষ গুম হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। তথাকথিত ক্রসফায়ারে হত্যাও করা হয়েছে অনেককে। কিন্তু, ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগ সরকারকে টিকিয়ে রাখতে হানাদার বাহিনীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন কিসমতে মত বেশ কিছু র‌্যাব, গোয়েন্দা এবং পুলিশের সদস্য। তবে তাদের অপকর্মের দায় ঐ বাহিনীগুলির প্রধানরা ছাড়াও চার জন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন, শামসুল হক টুকু, মহিউদ্দিন খান আলমগীর, এবং বর্তমান আসাদুজ্জামান কামাল সহ সরকারের নীতির কারণে সরকার প্রধানের ওপর বর্তায়।

খুন গুম শেষ করে কিসমত হায়ত ফিরে গেছে নিজ বাহিনীতে। পারও স্ত্রী আছে সন্তান আছে দুটি যারা এখন কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। অথচ, কিসমতের হাতে অন্যায়ভাবে গুম হওয়া ব্যক্তিগন আজও ফেরেনি নিজ বাসায়। এখনও তাদের অপেক্ষায় রয়েছেন বৃদ্ধা মা, স্ত্রী ও সন্তানেরা। নিখোঁজদের ভাগ্যে কী ঘটেছে তা হয়তো কোনোদিনই আর জানা যাবে না। তবুও আপনজনরা আজও পথ চেয়ে আছেন!

বসনিয়ায় যেরূপ গণহত্যার বিচার হয়েছিল, এ সকল সিরিয়াল কিলারদের তেমনি বিচার করা দরকার। অথবা এই সরকারের বানানো মানবতাবিরোধী ট্রাইবুনাল তো রইলই, যেখানে ক্যাপিটেল পানিশমেন্ট দিতেও খুব বেশি কাগজপত্র লাগে না!

Looks like you have blocked notifications!
Ads
[json_importer]
RELATED ARTICLES

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

Most Popular

Recent Comments