Sunday, February 5, 2023
বাড়িopinionগত ছয় মাস ধরে একটি বেসরকারি ব্যাংকে মাত্র ৩ মিলিয়ন ডলার জমা...

গত ছয় মাস ধরে একটি বেসরকারি ব্যাংকে মাত্র ৩ মিলিয়ন ডলার জমা রেখেছে সরকার : তুহিন

Ads

বিশ্বব্যাংক আইএমএফের ঋণের আশায় দীর্ঘদিন ধর্ণা দেওয়ার পর অবশেষে শর্ত সাপেক্ষে রিন্ পাচ্ছে। তবে কি কি শর্ত দেওয়া হয়েছে তা নিয়ে রয়েছে নানা ধোঁয়াশা। রাজনৈতিক অঙ্গনেও এই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে ব্যাপকভাবে। এই ব্যাপারটি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি স্ট্যাটাস দিয়েছেন সাংবাদিক আরিফুজ্জামান তুহিন। নিচে সেটি তুলে ধরা হল –

বিশ্বব্যাংক আইএমএফের ঋণের রাজনীতিও যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন জোট কর্তৃক আওয়ামী লীগ সমর্থন?
পদ্মাসেতু দুর্নীতির একটা পরিকল্পনা বা নীলনকশা বিশ্বব্যাংকের হাতে যায়। সেটা দেখেই বিশ্বব্যাংক পদ্মাসেতু প্রকল্পে অর্থ দেয়া বন্ধ করে দেয়। এমন না বিশ্বব্যাংক ধোয়া তুলসি পাতা। অথচ ওই একই সময় একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণ কাজ নির্দিষ্ট একটি ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানকে দিতে দফায় দফায় চিঠি দেয় এবং সরকার সেটি করেও। ওই বিদ্যুৎকেন্দ্রের লোকাল এজেন্ট ছিলেন পদ্মাসেতু প্রকল্প কেলেঙ্কারিতে যার নাম প্রধানভাবে এসেছিলো সেই আবুল হোসেন। পদ্মাসেতুতে বিশ্বব্যাংকের পিছুহটার পেছনে দুর্নীতির অভিযোগটি একটি উছিলামাত্র, এটি ভিষণভাবে ওয়াশিংটনকে নির্দিষ্ট লবিষ্ট দিয়ে করানো হয়েছে বলেই মনে করি।
বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ ভিন্নভিন্ন প্রতিষ্ঠান হলেও এরা নীতিগতভাবে দুটোই একইধরনের প্রতিষ্ঠান। এই বিষয়টি বুঝতে আমরা বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের ওপর প্রভাব কোন রাষ্ট্রের কতখানি সেটা খানিক তলিয়ে দেখব।

বিশ্বব্যাংক:
বিশ্বব্যাংকের ১৮৯টি সদস্য রাষ্ট্র। এদের ভোটে ২৫ জনের একটি নির্বাহী পরিচালক বোর্ড গঠন হয়। বিশ্বব্যাংকের সকল খবরদারিত্ব মূলত বোর্ড অব গর্ভনরের হাতে। এই বোর্ড অব গর্ভনরের এ পর্যন্ত ১৩ জন প্রেসিডেন্ট জন্মকাল থেকে এসেছেন ১৩ জনই যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক। বিশ্ব ব্যাংকের প্রধান হচ্ছে প্রেসিডেন্ট এবং তিনি পুরো বিশ্ব ব্যাংক গোষ্ঠীর সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

কাকে ঋণ দেয়া হবে, কিভাবে ঋণ পাবে সব ঠিক করে এই বোর্ড। শুরু থেকেই বিশ্বব্যাংক ঋণ দেয়ার বিষয়টি রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। মূলত বিশ্বব্যাংক কমিউনিস্ট বিরোধী মনোভাব নিয়েই তাদের কর্মসূচি শুরু করেছিল। ১৯৬৮ সালে ফ্রান্স ২৫০ মিলিয়ন ডলারের একটি ঋনের আবেদন করে বিশ্বব্যাংকের কাছে। ঋণ পেতে শর্ত হিসেবে তখন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ফ্রান্সকে বলা হয়েছিল, সরকারের জোট থেকে কমিউনিস্ট পার্টিকে বের করে দেয়া। ফ্রান্স সরকার তাদের কোয়ালিশন থেকে কমিউনিস্ট পার্টিকে বের করে দেয়। এরপরেই ঋণ দেয় বিশ্বব্যাংক।

বিশ্বব্যাংকের ঋণ পরিবেশ বিরোধী, শিশু স্বাস্থ্য বিরোধী, প্রান্তিক ঝুকিপূর্ণ জনগোষ্ট্রী বিরোধী সহ বিভিন্ন ধরনের অভিযোগ রয়েছে এই প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে। বিশেষত যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক প্রভাব ও তার গৃহিত কর্মসূচির বাইরে কোনো দেশ গেলে বিশ্বব্যাংক সেখানে হস্তক্ষেপ করে থাকে বলে অভিযোগ রয়েছে। বিশ্বব্যাংকে একমাত্র যুক্তরাষ্ট্রের ভেটো প্রয়োগের ক্ষমতা রয়েছে। অর্থাৎ শেষ পর্যন্ত যে কোনো সিদ্ধান্তে যুক্তরাষ্ট্র ভেটো প্রয়োগ করতে পারে।

বিশ্বব্যাংকে যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ার রয়েছে ১৫.৫৯ শতাংশ, জাপানের ৭.৩৫ শতাংশ, চীনের ৫.৭ শতাংশ, জার্মানির ৪.২১ শতাংশ, ফ্রান্সের ৩.৮৭ শতাংশ ও যুক্তরাজ্যের ৩.৮৭ শতাংশ। ভারতের ৩.০৪ শতাংশ। রাশিয়ার ২.৯৩ শতাংশ ও কানাডার ২.৬১ শতাংশ। এই নয়টি দেশ বিশ্বব্যাংকে সুপার পাওয়ার। লক্ষ্য করুন যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, কানাডা, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ফ্রান্স ও ভারত একই লাইনে থাকে, তারা মিত্র দেশ। সেক্ষেত্রে মিত্র দেশই এখানে সুপার পাওয়ার। চীন ও রাশিয়ার প্রভাব সেখানে নগণ্য।
যদিও পদ্মাসেতুতে ঋণ না দেয়ার বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের একটি বক্তব্য আছে, সেখানে তারা ৪টি শর্ত বাংলাদেশ সরকারকে দিয়েছিল। সরকার দুটি পালন করেছিল আর দুটি করেনি। এই অভিযোগে তারা ঋণটি বাতিল করে। তবে এসব অজুহাত মনে হয়েছে। কারণ এর থেকে ভয়াবহ খারাপ প্রকল্পে বিশ্বব্যাংক ঋণ দিয়েছে।
আইএমএফ:
আইএমএফের সদস্য রাষ্ট্র ১৯০টি। প্রতিষ্ঠানটি সদস্য রাষ্ট্রের ভোটে একটি বোর্ড গঠন করে। সেখানে যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, জাপান, ফ্রান্স, চীন ছাড়া অন্য সবার শেয়ার ও ভোট অনেক নিচে। যুক্তরাষ্ট্রের ভোট মোট ভোটের ১৬.৫০ শতাংশ, জাপানের ৬.১৪ শতাংশ,নেদারল্যান্ডসের ১.৭৬ শতাংশ, মেক্সিকোর ১.৮০ শতাংশ, সৌদি আরবের ২.০৯ শতাংশ, ইতালির ৩.০২ শতাংশ, ফ্রান্সের ৪.০৩ শতাংশ, যুক্তরাজ্যর ৪.০৩ শতাংশ। চীনের ৬.০৮ শতাংশ, রাশিয়ার ২.৫৯ শতাংশ, ভারতের ২.৬৩ শতাংশ।
উপরের নামগুলো দেখে সহজেই বুঝতে পারবেন এসব দেশ কোনটি যুক্তরাষ্ট্রের অ্যালাইয়ের ভেতর আর কোনটি রাশিয়া ও চীনের অ্যালাইর ভেতর। বাংলাদেশ বিশ্বব্যাংকের মোট ভো টের ০.২৪ শতাংশ। বিশ্ব ব্যাংক ও আইএমএফ একই ধরনের নীতিতে চলে।
১৯৮৯ সালে মন্ট্রিল প্রটোকলে বিশ্বব্যাংক যুক্ত হবার পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোকে সে তার কাজের সঙ্গে যুক্ত করেছে। সে হিসেবে এমন কোনো প্রকল্পে বিশ্বব্যাংক ঋণ দিতে পারে না যা পরিবেশকে ধবংস করে।

বিশ্বব্যাংকের সহযোগী প্রতিষ্ঠান আইএফসির কাছ থেকে বাংলাদেশের এমন সব প্রাইভেট প্রতিষ্ঠান ঋণ নিয়েছে যারা পরিবেশ ধবংসের অভিযোগ রয়েছে। এসবের মধ্যে এ্যাস্কয়্যার নিট কম্পোজিট লিমিটেডের ২২ মিলিয়ন ঋণ। এ দিয়ে তারা ময়মনসিংহের ভালুকায় কোম্পানির কারখানা সম্প্রসারণ করেছে। ভালুকার পরিবেশ নদী খালগুলো এসব নিট কম্পোজিট কারখানা কতটা ভয়াবহ দুষণ ঘটাচ্ছে নিজের চোখে যে কেউ দেখে আসতে পারেন। আইএফসির ঋণ পেয়েছে অনন্ত গ্রুপ, প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ, সামিট পাওয়ার, ইউনাইটেড গ্রুপ। এদের প্রত্যেকটির বিরুদ্ধে এমন সব অভিযোগ রয়েছে যা বিশ্বব্যাংকের কোড অব কনডাক্ট ভায়োলেট করে। তারপরও আইএফসি তাদের ঋণ দিয়েছে। তার মানে বিশ্বব্যাংক এমন কোনো পুত পবিত্র প্রতিষ্ঠান নয় যে যারা তাদের লিখিত নিয়মগুলো তারা ভঙ্গ করে না।
আইএমএফের ৪.৫ বিলিয়ন ডলার ঋণ কী বার্তা দেয়?

বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের ঋণ মূলত ঋণের চেয়ে বেশি রাজনীতি। কোনো দেশের ওপর তাদের দীর্ঘমেয়াদি গৃহিত নীতিগুলো বাস্তবায়ন হিসেবে এইসব ঋণ তারা দিয়ে থাকে। ইউরোপের দেশ গ্রীসের আর্থিক সংকট যে গভীর হবে তা ২০০৪ সাল থেকে আইএমএফ জানত। অন্তত তাদের ইর্ন্টানাল পরিচালক লেভেলের গোপন বৈঠকের তথ্য কিন্তু তাই বলছে। গ্রীসের অর্থনীতিকে রক্ষা করতে আইএমএফ বেইল আউট প্রগ্রাম হিসেবে ১২০ বিলিয়ন ডলার ঋণ দেয়। ২০১৫ সালে এসে গ্রীস দেউলিয়ার দিকে চলে যায় প্রায়। সে সময় গ্রীস আইএমএফকে ১.৭ বিলিয়ন ডলারের একটি কিস্তি শোধ করতে ব্যর্থ হয়। গ্রীসে বেকারত্ব গিয়ে পৌছায় ২৭.৮ শতাংশে। সেখানে ইউরোপিয় ইউনিয়ন হস্তক্ষেপ করে তারা গ্রীসকে ৮০ বিলিয়ন ইউরো ঋণ দেয়।

প্রতি বছর ইউরোপিয় ইউনিয়ন ঋণ দিচ্ছে গ্রীসকে, সাথে গ্রান্টও রয়েছে। এর ফলে গ্রীসের বেকারত্ব নেমে ২৭.৮ শতাংশ থেকে নেমে ১৬.৬ শতাংশে এসে দাড়িয়েছে। জিডিপি ভাবা হয়েছিল ১.৪ সেখানে বেড়ে ২.৪ গিয়ে দাড়িয়েছে। গ্রীস ধ্বসে যাওয়া থেকে আপাত রক্ষা পেয়েছে।

বাংলাদেশে কী কী শর্তে আইএমএফ ঋণ দিয়েছে তার ওপর নির্ভর করবে বাংলাদেশ গ্রীসের মত খারাপ অবস্থায় পড়বে, নাকি বাংলাদেশ স্থিতিশীল একটি উন্নয়ন অব্যাহত রাখবে। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের ঋণের শর্তগুলো যা মিডিয়াতে এসেছে তা বড় ধরনের সংস্কারের কথা শোনা যাচ্ছে না। যদি সরকার কৃষি ও জ্বালানিতে (বিদ্যুৎ ও জ্বালানি) নতুন করে আর সংস্কার না করে এবং সেখানে যতখানি ভর্তুকি আছে তা অব্যাহত রাখে তাহলে আইএমএফের এই ঋণের ভিন্ন বার্তা দেয়।

সব সময় মনে রাখা উচিত বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ যা করে তাহলো রাজনীতি। বর্তমানে শাসক আওয়ামী লীগ সরকারের ওপর সব থেকে বড় চাপ প্রতিদিন বৈদেশিক মুদ্রার মজুত কমে যাওয়া। মজুত দ্রুত বাড়াতে আইএমএফের ৪.৫ বিলিয়ন ঋণ টনিকের কাজ করবে সন্দেহ নেই। এর ফলে এই সরকার মজবুত ভিত পাবে সরকার পরিচালনায়। রির্জাভের অবস্থা কত খারাপ তার একটি উদাহরণ দেই। একটি বিদেশী প্রতিষ্ঠান সরকারের একটি উন্নয়নমূলক কাজ পেয়েছে গত ছয় মাস আগে। প্রতিষ্ঠানটি তার ব্যাংক গ্যারান্টি জমা দিয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী সরকার তাকে ১০ শতাংশ অগ্রিম দেবে। এই অগ্রিম অর্থ ডলার হিসেবে দিতে হবে। সরকারের হাতে টাকা আছে কিন্তু ডলার নেই। গত ছয় মাস ধরে একটি বেসরকারি ব্যাংকে মাত্র ৩ মিলিয়ন ডলার জমা রেখেছে সরকার, ওই ব্যাংক প্রকল্পটির ঠিকাদারকে বাকি ৪ মিলিয়ন ডলার যোগাড় করে দিতে পারেনি। এই হলো সার্বিক পরিস্থিতি বোঝার জন্য একটি উদাহরণ মাত্র। এর মধ্যে প্যানিক ডলার কেনা শুরু হয়েছে। অনেকে ডলার কিনে মজুত করছেন। এতে আরও খারাপ হয়েছে অবস্থা। এরকম অবস্থায় আইএমএফের ৪.৫ বিলিয়ন ডলার ঋণ সরকারকে লাইফ লাইন দিয়েছে। সরকারকে খাদের কিনারা থেকে তুলে আনবে এই ঋণ।

আইএমএফের ঋণ দেয়ার মধ্য দিয়ে একইসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র জাপান ও তার পশ্চিমা মিত্রশক্তিরা সরকারকে ’পলিটিক্যাল সিগনাল’ দিয়েছে বলেই আমার মত। এর অর্থ যুক্তরাষ্ট্র ও কোয়াড অ্যালায়েন্সের জোটশক্তি আওয়ামী লীগ সরকারকেই এর পরেরবার নির্বাচনেও দেখতে চায়। যুক্তরাষ্ট্র ও কোয়াড অ্যালায়েন্সের জোটশক্তি দুনিয়ার প্রধান চালিকা শক্তি। যদি এই শক্তি আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় দেখতে না চাইতো তাহলে এইরকম দুর্যোগের মূহুর্তে আওয়ামী লীগকে ৪.৫ বিলিয়ন ডলার ঋণ দিতো না আমি বার্তাটি এমনভাবেই পড়েছি।

Looks like you have blocked notifications!
Ads
[json_importer]
RELATED ARTICLES

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

Most Popular

Recent Comments